একটি শেয়ারের দাম কমে এবং বাড়ে কিভাবে জানুন | 2020

একটি শেয়ারের দাম কমে এবং বাড়ে কিভাবে জানুন | 2020

আজকের পুরো আর্টিকেলে   ”

একটি শেয়ারের দাম কমে এবং বাড়ে কিভাবে জানুন

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে বহুবছর আমি এম-বি-এ-তে পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট আর ম্যাক্রোইকোনোমিক্স পড়াতাম। শেয়ার মার্কেট যে কতবড় শয়তানির জায়গা সেটা স্বাক্ষ্যপ্রমাণ সহ দেখাবার পর ছাত্র-ছাত্রীরা অবাক হয়ে যেত।

শেয়ার মার্কেট নিছক জুয়া খেলার জায়গা। এই জুয়ার নাম স্পেকুলেশন। যেমন ধরুন আপনি ভাবলেন আপনার জন্মতারিখ যেহেতু ১৯ তারিখ, আর এই তারিখটা নিশ্চয় শুভ, আপনি স্পেকুলেইট করলেন যে উনিশ নম্বর বক্সে হয়তো আপনার সৌভাগ্যের চাবিটি আছেঃ আপনি জুয়া খেলতে গিয়ে উনিশ নম্বর খেললেন। এই স্পেকুলেশন নিছক পাগলামি। এর কোন ভিত্তি নেই। জুয়ায় যে বাজি ধরে, সে আশায় তাকে ‘যদি লাইগ্যা যায়’। কিন্তু বছরের পর বছর ক্যাসিনোগুলি বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, লোকে যা আশা করে তা বাস্তবে ফলে না।

জুয়ার সাথে চুরি যোগ করলে হয় জুয়াচুরি। শেয়ার মার্কেট সৃষ্টির সময় থেকেই জুয়াচোরদের কবলে পড়েছে। এটা কিভাবে হয় দেখুন।

প্রথমে মনে রাখবেন শেয়ার মার্কেটে ঢুকেছে বিশাল এক বলদের দল, কেইন্স যাদেরকে বলতেন বুলস (ষাঁড়)। কত বড় বলদ হলে শেয়ারের দাম বাড়ার সময় শেয়ার কিনে, আর দাম কমার সময় বেচে? বুদ্ধি থাকলে শেয়ারের দাম বাড়লে বেচা উচিত আর কমলে কেনা উচিত। কিন্তু বলদের দল সবসময় ঠিক তার উলটা কাজটা করেঃ তাদের কোন রকম ধারণাই নাই দাম কেন উঠে আর নামে।

মের্টন মিলার নামে এক লোক দাবি করেছিলেন যে তিনি ধরে ফেলছেন কিভাবে শেয়ারের দাম উঠে আর নামে। শুনে তাঁকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হল, আর ওয়াল স্ট্রীটের লোকেরা তাঁর কাছে ৪০০০ কোটি ডলার (আনুমানিক ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা) দিয়ে বললো, আপনি শেয়ার কিনে বেচে আমাদেরকে লাভ করিয়ে দেন। ব্যস, ৬ মাসের ভেতরে প্রায় সব টাকাই তিনি লস দিলেন। তার মানে শেয়ারের দাম কমেবাড়ে কেন তা তিনি মোটেই জানতেন না, কেউ জানেনা, কারণ এটা একদম জুয়া। তাসের প্যাক থেকে ৫২টা কার্ডের ১ টা আপনি পাবেনঃ ৫২০০ বার পরীক্ষা করেই দেখুন আপনার একটা অনুমানও সত্য হয় কিনা।

এখন চোরের দল বলদের দলকে কিভাবে বোকা বানিয়ে ঠকায় সেটা দেখুন। আপনি দশজন বন্ধুসহ ২০০০ কোটি টাকা নিয়ে নামুন। ব্যাংকের সাহেবদের সাথে চুক্তি করুন যে আপনার

শেয়ারের কাগজ বন্ধক দিলে উনারা শেয়ারের মূল্যের ৯০% ঋণ দেবেন। আপনি ১ কোটি টাকার শেয়ার ২ নম্বর বন্ধুর কাছে ২ কোটি টাকা দামে বেচবেন। আপনার বন্ধু ব্যাংকের কাছ থেকে ১৮০ লাখ টাকা লোন নিয়ে আপনার শেয়ার কিনবেন। এইবার ৩ নম্বর বন্ধু সেই একই শেয়ার ৪ কোটি টাকায় কিনে নেবেন। মনে রাখবেন যিনি বিক্রি করছেন, তিনিই কিঞ্ছেন ভিন্ন নামে দল বেঁধে। এইবার আপনারা দল বেঁধে ব্যাংকের কাছে জামানত দেবেন ৪০ লাখ টাকা , আর ব্যঙ্ক দেবে ৩৬০ লাখ টাকা। আপনি নিশ্চয় ভুলে যাচ্ছেন না, যে আপনাদের ১ কোটি টাকার দাম এখন ৪ কোটি টাকা, তার মানে আপনাদের লাভ ৩ কোটি টাকা। কিন্তু শেয়ারের দাম আপনারা চক্রান্ত করে বাড়াচ্ছেন, আর ব্যাংকের সাহেবদেরকে ধোঁকা দিচ্ছেন।

এইবার বলদগুলি অবাক চোখে দেখবে হায় হায় কোম্পানির শেয়ারে না জানি কি গোপন মহিমা আছে, কিছুদিনের ভেতর ১ কোটি টাকা হয়ে গেছে ৪ কোটি টাকা। ব্যস, আর যায় কোথায়ঃ সকল বলদ পাগল হয়ে বাপের কবর, মায়ের হাড্ডি, বউদের পরণের শাড়ি, নিজের গায়ের জামা বেচে দিয়ে শেয়ার কিনা শুরু করেছেঃ এই বদ্ধ উন্মাদের দল কল্পনা করছে শেয়ারের দাম বাড়বেই, যদিও তারা জানেনা কেন বাড়বে, কারা বেশি দামে কিনবে। দেখা যাবে ৪ কোটি টাকার শেয়রের দাম ৩২ কোটি টাকা হয়ে গেছে মাত্র কয়েক দিনে। তখন আপনারা সব শেয়ার বেচে দিয়ে ২৫ কোটি টাকা লাভ নিয়ে সরে পড়বেন। দাম আপনারাই বাড়াচ্ছিলেন, কিন্তু পাব্লিক সেটা জানে নি। আপনার সরে পড়ার পর দাম বাড়ানোর কেউ নাই, তখন শেয়ারের দাম আবার এক কোটিতে নেমে আসবে, কারণ এর দাম একপয়সা বাড়ার কারণ ছিলোনা। বলদের দল জবাই হয়ে যাবে, তাতে আপনার কি?

আমার পরামর্শঃ যদি ১০০ কোটি টাকার কম পুঁজি থাকে, তাহলে শেয়ার মার্কেট আপনার জন্য হারাম। আপনার সাথে ৪০ টা ব্যাংক মালিকের খাতির থাকা দরকার, যারা আপনার জোচ্চুরিতে সায় দেবে আর গোপনে আপনার সাথে লুটের মাল ভাগ করে নেবে। আড়ালে থেকে দল বেঁধে নিজেরদের মধ্যে কিছু শেয়ার কিনেবেচে দাম বাড়িয়ে যাবেন আর অপেক্ষায় থাকবেন কখন বলদের দল কিনতে শুরু করে, তখন আপনাদের শেয়ারগুলি ছেড়ে দেবেন। এটা শুরু করতে গেলে বুকের পাঁটা নয়, রীতিমত পাহাড় লাগবে। এই জন্যই বলা, শিউর হতে চান তো কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে নামুন, সাথে নেন ব্যাঙ্কারদেরকে যারা আপনাকে ২০,০০০ কোটি টাকা যোগান দেবেন। সব বলদের শিং ভাংতে কম টাকায় হবে না।

শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করা হারাম ঘোষণা করা উচিত। কিন্তু সেটা কোন দিন হবে না। বলদের দল রেডী আছে লোভে পড়ে মারা যেতে, তাহলে হায়েনারা কেনইবা তাদেরকে টোপ দিয়ে ভাগাড়ে নিয়ে মেরে খেয়ে ফেলবে না? আমার উক্কতি একদম পরিষ্কারঃশেয়ার মার্কেটে জুয়া খেলতে যারা যায়, তাদের তাকা মেরে দেওয়াই উচিত, কারণ ওদের লোভ একদম যুক্তিহীন।

সোজা ফরমুলা মনে রাখবেনঃ শেয়ারের দাম বাড়লে কোন দিন সেটা কিনবেন না; দাম কমলে কোনদিন সেটা বেচবেন না। শেয়ার কিনবেন আগের চেয়ে দাম যদি ৪০% কমে, আর কমপক্ষে ৫ বছর ঐ শেয়ারে হাত দেবেন না, দাম করুক আর বাড়ুক। ৫ বছর পরে, আপনার কেনা শেয়ারের দাম যদি ৬০% বাড়ে, বেচে দেবেন। তা না হলে ধরে রাখুন। কি কচুর বিনিয়োগকারী যে একটা বিনিয়োগ ১০-২০-৫০ বছর ধরে রাখতে পারেন না?

আমার কিছু শেয়ার আছে। ১০০ টাকা দামে ১৯৮৪ সালে কিনেছিলামঃ আজ অবধি বেচার চিন্তাও করিনি। ৩৬ বছরে শেয়ারের দাম মোটামুটি ৩৭ গুন বেড়েছে। কিন্তু ১০০ টাকার শেয়ারের থেকে ৩৫ বছরে আমি লভ্যাংশ নিয়েছি ১৪০০০ টাকার বেশি। বিনিয়োগ করবেন কেবল লভ্যাংশ বিচার করে, শেয়ারের দাম বাড়ে না কমে সেটা ভাববেন না। আপনি যদি না বেচেন, তাহলে শেয়ারের দাম বাড়ল না কমলো সে নিয়ে আপনি কেন বেহুদা মাথা ঘামাবেন? একটা ১০০ টাকার শ্যেয়ার থেক বছরে ৪০০ টাকা লভ্যাংশ পাচ্ছি, আর কি দরকার? শেয়ারের দাম ৩৭০০ টাকার উপরে বহুদিন ধরেই ছিল কিন্তু আমি কেন বেচব?

আমি জানি আমার কথা অনেকের পছন্দ হবে না। না হোক। বলদের স্বাধীনতা আছেই বলদ হয়ে থাকার। আমার পরামর্শ মানেনি অনেকে, মারা গেছে, তাতে আমার কি? জোচ্চোর ছাড়া শেয়ার মার্কেট থেকে কে লাভ করেছে?

লেখক: Mohammad Gani

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *